কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশী বিনিয়োগ প্রতিবেদন

নতুন হিসাবে নিট প্রবাহ কমেছে ৫০ শতাংশ

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করেই ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবায়ন করত বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে গত বছর তা নতুন

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করেই ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবায়ন করত বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে গত বছর তা নতুন পদ্ধতিতে শুরু হয়। এতে রিজার্ভ কমে যায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। বিদেশী বিনিয়োগের হিসাবের ক্ষেত্রেও নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ফলে বদলে গেছে বিদেশী বিনিয়োগের নিট প্রবাহ পরিসংখ্যান, কমে গেছে ৫০ শতাংশ।

প্রতি বছরের মতো এ বছরও বিদেশী বিনিয়োগ ও ঋণবিষয়ক ‘ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এক্সটারনাল ডেট জানুয়ারি-জুন ২০২৪’ শীর্ষক অর্ধবার্ষিকী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গতকাল প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনটি। নতুন হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে একই অর্থবছরের পরিসংখ্যান আগের প্রতিবেদনের চেয়ে ভিন্ন এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদেশী বিনিয়োগের তথ্যের পরিসংখ্যানে পরিবর্তন এসেছে। কারণ এখন হিসাবায়নে বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। আর তা ২০১৯ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের পরিসংখ্যানে প্রয়োগ করা হয়েছে। এ কারণেই একই অর্থবছরের পরিসংখ্যান নতুন ও পুরনো প্রতিবেদনে ভিন্ন এবং বেশকিছু ক্ষেত্রে পরিমাণ কমে গেছে। আগে যেকোনো কারণেই হোক নতুন হিসাবায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইএমএফ আগে নানা ধরনের কথা বলত পরিসংখ্যান নিয়ে। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যবহার করে আমরা হিসাব করতাম না। মূলত তাদের চাপেই এখন বিওপি ম্যানুয়াল বা বিপিএম৬ অনুযায়ী হিসাব করা হচ্ছে। রিজার্ভের হিসাবের মতো এখন বহিঃখাতের অন্যান্য উপাদান যেমন এফডিআইয়ের পরিসংখ্যান হিসাবের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিয়মে হিসাব করতে গেলে সব ক্ষেত্রেই এখন বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট এফডিআই ইনফ্লো বা নিট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ১৬০ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। যেখানে ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে ছিল ৩২৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। নতুন হিসাবে একই অর্থবছরের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহের পরিমাণ কমেছে ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

একইভাবে বদলে গেছে এফডিআই স্টক বা পুঞ্জীভূত বিদেশী বিনিয়োগের পরিসংখ্যানও। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এফডিআই স্টকের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই সময়ের এফডিআই স্টক ১ হাজার ৭২৮ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসাবে একই সময়সীমায় এফডিআই স্টকের পরিসংখ্যানে তারতম্য ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটাতে গত বছরের শুরুতে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা নেয়ার চুক্তি করে বাংলাদেশ। তবে এ ঋণ পেতে হলে এক ডজনের বেশি শর্ত পূরণের শর্ত বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে অন্যতম শর্ত ছিল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিওপি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবায়ন করা। গত বছরের জুন থেকে বিপিএম৬ (ব্যালান্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল) হিসাবে পরিচিত এ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাবায়ন শুরু হয়। এতে রিজার্ভের পরিমাণ নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতির সঙ্গে বিপিএম৬-এর ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের মতো ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদে রিজার্ভের হিসাবায়নও বেশি দেখানো হতো। ২০১২ সালে সারা বিশ্বেই রিজার্ভ হিসাবায়ন পদ্ধতিতে বিপিএম৬ অনুসরণ শুরু হয়। কিন্তু রিজার্ভসহ বিওপির হিসাবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসরণ করেনি। এ কারণেই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সব সূচকে বড় ধরনের তারতম্যের সৃষ্টি হয়। এ ধারাবাহিকতায় দেশে আসা বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহের পরিসংখ্যানও বদলে গেছে।

নতুন হিসাব পদ্ধতি প্রয়োগে অনেক কমে গেছে নিট এফডিআই প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১৪৬ কোটি ৮১ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। আবার ১৪৬ কোটি ডলারের মধ্যে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আয় থেকে পুনরায় বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের আধিক্যই বেশি। অর্থাৎ নতুন বিদেশী বিনিয়োগ তেমন একটা আসেনি।

নতুন হিসাবে এফডিআই স্টকের পরিমাণ এখন ১৭ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা এক বছরে বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্সের চেয়েও কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ২১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসেছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।

নতুন হিসাবায়ন পদ্ধতির প্রয়োগ আরো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন মানদণ্ড প্রয়োগ হচ্ছে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন আসছে, এতদিন বাড়তি যে এফডিআই ইনফ্লো আমরা জেনেছিলাম সে অর্থ গেল কোথায়? বাংলাদেশ ব্যাংকে এ অ্যাকাউন্টিং নিশ্চয়ই করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে সমপরিমাণ টাকাও সরকারকে মানি সাপ্লাইয়ের ভেতরে যোগ করতে হয়েছে। বিপিএম৬ ধরার কারণে এখন সংখ্যাটি যদি এফডিআই অংশে কমে যায়, এখানে অনুমান করা যায় যে বাকি অংশটা অন্য কোনো হিসাবে আছে। অর্থাৎ কোনো এক অর্থবছরে নিট এফডিআই যে ৫০ শতাংশ কমে গেল, এ অংকটা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন হিসাবে আছে? এ বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার দরকার আছে।’

আরও